ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় সরকার
আজ ১৯ জুলাই, রোববার। ২০২৪ সালের এই দিন শুক্রবার ছিল। সারাদেশে দ্বিতীয় দিনের মতো ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন। এ কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, গুলী, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এদিন শুধু ঢাকায় অন্তত ৬২ জন নিহত হন। ঢাকার বাইরে রংপুরে দুইজন, সাভার, সিলেট ও নরসিংদীতে একজন করে মোট পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় দেশের শীর্ষ স্থানীয় মিডিয়াগুলো থেকে।
আন্দোলন ছড়িয়ে পরবে এমন আশঙ্কায় স্বৈরাচার শেখ হাসিনা আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীকে লেথেল ওয়পন মানে মারণরাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে পুলিশ-র্যাবের কতিপয় কর্মকর্তা। তারা সাথে সাথেই শেখ হাসিনার সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন শুরু করে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সন্বয়কদের একে অপরের সাথে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে আন্দোলন দমন করতে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করতে শুরু করে পুলিশ-র্যাব। ব্যবহার করে তাজা বুলেট, মারণাস্ত্র। হাসপাতালগুলো উপচে পড়ে হতাহতদের দিয়ে। রাতদিন চিকিৎসা দিয়েও শেষ করতে পারেনি ডাক্তাররা। অন্যদিকে গণহারে গ্রেফতার চালিয়ে যায় পুলিশ-র্যাব। এদিন ঢাকার অলিতে গলিতে থাকা মেসগুলোতে অভিযান চালায় আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের লোকজন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে যায় শিক্ষার্থী ছাত্রদের মেসে। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের এদিনের ভূমিকা ১৯৭১ সালকে মনে করিয়ে দেয়। সমন্বয়কদের ভাষায়, ১৯৭১ সালে ঘরে ঘরে মুক্তিযোদ্ধা খোঁজা হতো। ২০২৪ সালে এসে খোঁজা হয় শিক্ষার্থী তরুণদের, আন্দোলনকারীদের। এবছর আওয়ামী লীগের লোকজন শিক্ষার্থীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশকে নিয়ে যায় বাসায় বাসায়, ছাত্রাবাসে। ছাত্ররা থাকে এমন মেসগুলো তন্ন তন্ন করে অভিযান চালায় গ্রেফতারের জন্য। কোনভাবেই যাতে আন্দোলন না চালিয়ে যেতে পারে এজন্য তরুণদের গ্রেফতারে নামে পুলিশ-র্যাব। বুঝতে পেরে কেউ বাসাতে অবস্থান করেনি। তারা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী আত্মীয় স্বজনের বাসায় অবস্থান করে। এদিন আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা মাঠে নামে। তারা আন্দোলন মনিটরিং করার কাজটি করতে থাকে।
এদিন শুক্রবার জুমার নামাযের পরে ছাত্র-জনতার ওপর টার্গেট করে স্নাইপার থেকে গুলী চালিয়ে বহু লোককে শহীদ করা হয়। ১৯ জুলাই দিনের বেলায় আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামে। তারা বিভিন্ন পয়েন্টে আন্দোলন বিক্ষোভ করতে থাকে। পুলিশ র্যাব আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে। এতে শত শত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী গুলীবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালমুখী হতে থাকে। এদিন এতো সংখ্যক হতাহত হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসে যে, ডাক্তাররা হতবাক হয়ে বলে ওঠেন যে, নরকের দরজা খুলে গেছে। এদিন আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর গুলীতে ঝাঝড়া হয়ে হাসপাতালগুলো ভরে যায় রোগীতে। হাসপাতালের সমস্ত চিকিৎসক স্টাফ মিলেও রোগী সামাল দিতে হিমসিম খেতে হয়।
সেদিন হাসপাতালগুলোর কি দৃশ্যপট ছিল তার বর্ণনা পাওয়া যায় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলার জবানীতে। ১৮ জুলাই থেকে শুরু হয় রোগী আসা। সেদিনের চেহারাটা ছিল অত্যন্ত বিভৎস। আমি তখন অপারেশন থিয়েটারে রেগুলার ওটি করছিলাম। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। তখন বর্তমান হাসপাতালের এডি রেজুয়ানুর রহমান সোহেল ভাই, ওটিতে গিয়ে নক করে বলেন নীলা তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসো। নিচেতো নরকের দরজা খুলে গেছে। আমি ওটি শেষ করে নিচে নেমে আসি। নিচের দৃশ্য দেখে আমি ধপাস করে পড়ে যাই। আমি দেখতে পাই, শত শত মানুষ। কেউ একহাতে চোখ ধরে আছে। কেউ দুই হাত দিয়ে দুই চোখ ধরে আছে। চোখগুলো ক্ষত বিক্ষত। রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। বিভৎস চেহারা দেখতে পাই। এদের বয়স হচ্ছে ১৪ থেকে ২৫/২৬। ইয়াং জেনারেশন যাদের বলে। তারপর আমাদের দশ টেবিলে ওটি শুরু হয়ে গেলো। সেদিন ওটি রাত ১০টা পর্যন্ত চলেছে। আমরা হাসপাতালের জনশক্তি যারা ছিলাম সবাই ওটিতে অংশ নিয়েছি। আমি বাসায় এসে দেখি ওয়াই-ফাই কানেশন অফ হয়ে গেল। তারপর ১৯ তারিখ। সেদিনের চেহারাও একইরকম। ১৯ তারিখ সকালেই হাসপাতালে গেলাম। রাস্তায় যানবাহন ছিল না। বাসা থেকে রিকশায় ভ্যানে করে গেলাম। সেদিন আলাপ করে সকাল থেকেই ওটি শুরু করি। কারণ আমরা বুঝলাম সকাল থেকে ওটি শুরু না করলে শেষ হবে না। এরপরও শেষ করা যায়নি। কারণ সেদিন আরও বেশি রোগী আসে। সেদিন কারো বিশ্রাম ছিল না।
এদিন আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলী ছোড়া হয়। তবে র্যাবের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘তারা আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। হেলিকপ্টার থেকে কোনো গুলী ছোড়া হয়নি, বরং উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়েছে।’ বিজিবির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে পুঁজি করে যারা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাচ্ছে, তাদের শক্ত হাতে দমন করা হবে। এদিন সরকারের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব ফের প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র অন্দোলন ৯ দফা দাবি পেশ করে। আন্দোলনের সমন্বয়করা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এদিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান তাদের অভিভাবকরাও। ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ শীর্ষক ব্যানারে রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন করেন সর্বস্তরের অভিভাবক সমাজ।
১৯ জুলাই এই দিনে, শেখ হাসিনা সরকার মধ্যরাতে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে এবং দিনব্যাপী সহিংসতায় কমপক্ষে ৬৬ জন নিহত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে সরকার। এদিন নরসিংদী জেলা কারাগার ভেঙে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। এতে পালিয়ে যায় কয়েদিরা। মেট্রোরেল স্টেশন ও বিআরটিএ অফিসসহ আরও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হংয়। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে বাধা দেয়ার প্রয়াসে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জনসমাগম ও মিছিল অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে। ১৮ জুলাই থেকে ইন্টারনেট অ্যাক্সেস দেশব্যাপী বন্ধ রাখা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন সহিংসতা, গুলী, অগ্নিসংযোগ ও মৃত্যুতে কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকা। মিরপুর ১০ ও কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনে ভাঙচুর চালানো হয়।
১৮ জুলাই কেবল ঢাকা মহানগরীতেই গুলী ও সংঘর্ষে অন্তত ৪৪ জন নিহত হওয়ার খব আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। ঢাকার বাইরে মোট ৫৯ জন নিহত হয় বলে জানায় দেশী-বিদেশী মিডিয়া। এতে ছাত্র, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ শত শত মানুষ হতাহত হয়। প্রথম দিকে আন্দোলনে শুধু শিক্ষার্থীরা অংশ নিলেও জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বস্থরের মানুষকে আন্দোলনে যোগ দিতে দেখা গেছে। সারাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ডাক ব্যাপকভাবে অব্যাহত থাকে।
১৮ জুলাইয়ের ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাইতেও সারাদেশে সকল ধরনের ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখা হয়। এইদিনেও সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক অবরোধ চলে। বেলা পৌনে ১টার দিকে আন্দোলনকারীরা কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানা ঘেরাও করলে থানার ভেতর থেকে পুলিশ সদস্যরা ছররা গুলী ছুঁড়েন, এতে শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ঢাকার উত্তরা, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা পল্টনসহ কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সারাদিন দফায় দফায় সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। মিরপুরে জুমার নামাযের পর বেলা তিনটার দিকে কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া এবং মিরপুর - ১০-এর বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় বেরিয়ে আসে। সাভারে বিকাল তিনটা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে হাজারো শিক্ষার্থী জড়ো হয়। বিকেল চারটার দিকে শিক্ষার্থীরা ঢাকার রামপুরা থানা ঘেরাও করে।
১৯ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রোধ করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ঢাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে ঢাকার সাথে সারাদেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। জাতীয় সংবাদপত্র অনুযায়ী ১৯ জুলাই শুক্রবার সারাদেশে কমপক্ষে ৫৬-৬৬ জনের মৃত্যু হয়।
একজন সমন্বয়কের ভাষায় ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে স্নাইপার অ্যাটাকে কারবালা নেমে এসেছিল। যাত্রাবাড়ীতে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধকে লেলিন গ্রাদের সঙ্গে তুলনা করেন কেউ কেউ । এদিন শুক্রবার জুমার নামাযের পরে ছাত্র-জনতার ওপর টার্গেট করে স্নাইপার থেকে গুলী চালিয়ে বহু লোককে শহীদ করা হয়। জুমার নামাযের পর পুলিশ তখন দল বেঁধে এসে গুলী করছিল এমনটা না। আবার থানা থেকে করছে এমনও না। তখনও পুলিশ থানার সামনে দল বেঁধেই ছিল। এদিকে ১৭ জুলাই থেকে যাত্রাবাড়ী থেকে বিশেষ করে শনির আখড়া, কাজলা হয়ে রায়েরবাগ ঢাকা-চিটাগাং মহাসড়কটা ছাত্রজনতার দখলে ছিল। যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ শনির আখড়া আসবে এমন সাহস তখনও করতে পারেনি।
ওইদিন কাজলা টোলপ্লাজা এলাকাতে গাছের বড় বড় গুড়ি ফেলে রাস্তা ব্লকেড করা হয়। কেউ স্লোগান দিচ্ছে। কেউ গোল হয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এমন সময় কোথা থেকে গুলীর শব্দ আসলো। এটা কোন দিক দিয়ে আসছে; ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। এক অটোড্রাইভার দাঁড়িয়েছিলেন। গুলী এসে তার মুখে লাগলো এবং মুখের গালের অংশ ছিঁড়ে নিয়ে চলে যায়। এই সময়টা গুলীর পর গুলী আসছে। সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে। কেউ কেউ পড়ে যাচ্ছে। আর উঠতে পারছে না। তখন ধারণা করা হলো স্নাইপার শ্যুট করা হচ্ছে। হাসপাতাল ভর্তি আহত লোকজনে। ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটে গেছে এবং আশপাশের ভবনের ছাদ বা জানালা থেকে শ্যুট কর হচ্ছিল। শুক্রবার জুমার নামাযের পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শত শত মানুষ চোখের পলকে আহত হয়েছে।