তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ইতোমধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি দলটির বাইরে থেকেও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে। সেই বিধান অনুসারে আগামী ২৪ অক্টোবরের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। ফলে রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কে আসীন হচ্ছেন এবং ক্ষমতাসীন বিএনপি কাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ।

জানা গেছে, বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আলোচনায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা

বিএনপির ভেতরে আলোচনায় থাকা নেতাদের তালিকায় রয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বর্তমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, এবং দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

তবে দলীয় নেতাদের বাইরে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে যে নামটি ঘিরে জোর আলোচনা চলছে তিনি হলেন সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এছাড়াও বিএনপির একাংশের ধারণা, বর্তমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবেও রেখে দেওয়া হতে পারে।

যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে কাউকে মনোনীত করার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সরকারি দলের কাছে রাষ্ট্রপতির পদটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ, কারণ আগামী দিনে যিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আসবেন, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সময়ও তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে সবদিক ভেবেচিন্তেই দলটি চূড়ান্ত পদক্ষেপে যাবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সচেতন মহল।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক পথচলা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: দেশের অন্যতম অভিজ্ঞ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই রাজনীতিবিদ ১৯৮০-র দশকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি বিএনপির মহাসচিব হন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপির প্রধান মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন: ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৯১ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জোট সরকারে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানে স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য হিসেবে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন, যদিও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ইদানীং আগের মতো সক্রিয় নন।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপিতে যুক্ত হন। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে স্বৈরাচার বিরোধী দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজপথের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন এবং বারবার পুলিশি নির্যাতন ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন।

ড. আবদুল মঈন খান: জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে বিজ্ঞানের অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান। দলের অন্যতম বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল নেতা হিসেবে সুশাসন ও পররাষ্ট্র নীতিতে তার অগাধ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ভোলা-৩ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের গঠিত বিএনপি সরকারে বাণিজ্য, পাট ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পান এবং ১২ মার্চ ২০২৬-এ স্পিকার নির্বাচিত হন। ২৪ জুলাই ২০২৬-এ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর থেকে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতির আসনে রেখে দেওয়ার আলোচনা জোরালো হলেও ১/১১-এর সময় দলের বিরুদ্ধে তার অবস্থান নিয়ে দলের ভেতরে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে।

অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী: ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা ও রাকসুর সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকে বলা হয় বিএনপির দুঃসময়ের কান্ডারী। ২০১৬ সালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন এবং বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থেকে চরম নির্যাতন ভোগ করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে আছেন। দলের ভেতর ও বাইরে তার গ্রহণযোগ্যতা চোখে পড়ার মতো।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সফলতা ও দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করেছেন। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার বিশাল ভাবমূর্তির কারণে বিএনপির বাইরে রাষ্ট্রপতির তালিকায় তার নাম সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসছে।