কামাল উদ্দিন সুমন
অবশেষে গুঞ্জনই সত্যি হতে যাচ্ছে। পদত্যাগ করছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। আজ শুক্রবার কিংবা কাল শনিবার বা রবিবার তিনি পদত্যাগ করবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তিনি পরিবারের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একটি ফোনালাপের বিষয় প্রকাশ হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন এমনটি জানা গেছে। মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব মো. নূরুল আমীন গতকাল বলেছেন, পদত্যাগপত্রে এখনো তিনি (রাষ্ট্রপতি) স্বাক্ষর করেননি। পদত্যগ করলে জানানো হবে। রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন বলেছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে।
সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জনে সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। চিকিৎসার জন্য বর্তমানে থাইল্যান্ড সফরে থাকা স্পিকার শুক্রবার দুপুরে দেশে ফিরছেন। শুক্রবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে থাইএয়াওয়েজের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকা অবতরণ করবেন। পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তার আগামী ২৬ জুলাই রোববার দেশে ফেরার কথা ছিলো। চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই ব্যাংকক সফরে যান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বঙ্গভবনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা স্বাস্থ্যগত কারণেই হোক, আর মানসিক কারণেই হোক। মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার কর্মকর্তাদের বলেছেন, দুয়েক দিনের মধ্যে তিনি বঙ্গভবনের পাট চুকিয়ে ফেলতে পারেন।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতির আলোচনায় কারা?
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও ক্ষমতাসীন বিএনপির উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নাম সম্ভাব্য পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে হঠাৎ করে আলোচনায় এসেছে। যদিও এর আগে এ পদের জন্য বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খানসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় ছিল।
বিএনপি সূত্র বলছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি ছাড়াও বিএনপির সিনিয়র নেতা ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খানসহ দলটির শীর্ষ কয়েকজনের নাম আলোচনায় আছে। আলোচনায় আছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারও। এছাড়া বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও আলোচনায় রয়েছে।
মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে কে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অবশ্য রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় থাকা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনও এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। এ পদে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নাম হঠাৎ আলোচনায় আসার বিষয়ে খন্দকার মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, এ বিষয়ে আমি একেবারেই অবগত নই। আর এমন কিছু ঘটলে (রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ) শূন্য পদে অনেক নামই আলোচিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিদেশে গিয়ে গোপন ফোনালাপের বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন নিয়ে কথা বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি বিদেশে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, এমন সুনির্দিষ্ট খবর পাওয়া যায়নি। এমন তথ্য পাওয়া গেলে তা অবশ্যই তদন্ত করা হবে।
চলতি বছরের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন টেলিফোনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শামা ওবায়েদ বলেন, এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পায়নি। যদি সেটা সত্যি হয়ে থাকে অবশ্যই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্ত করবে, সরকারও সেটা তদন্ত করবে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে সংবিধানে যা আছে:
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতিকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হবে। সরকার, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতাও তাই গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা।
সরকার রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বলেনি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বলেনি, তবে তিনি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে চাইলে স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। এক্ষেত্রে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। এ বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করেই বলা আছে।’’
তিনি বললেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে কোনো সংকট হবে না। এর আগেও রাষ্ট্রপতি ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদের দায়িত্ব হচ্ছে পদটি শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা।
জানা গেছে, দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। সে অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। তবে মেয়াদ শেষের আগেই দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছেন আলোচিত-সমালোচিত এই রাষ্ট্রপতি।
সূত্রমতে, ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে চলে যাওয়ার কয়েক মাস পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা এই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে তখন মাঠ ছিল দারুণ গরম। এমনকি বিক্ষোভকারীরা চলে যায় বঙ্গভবনের কিনারা পর্যন্ত। ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’রক্ষায় তখন বিএনপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভকারীদের সামাল দিয়ে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার শপথ নেওয়ার পরও রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সাহাবুদ্দিন। সরকারের পাঁচ মাসের মাথায় এখন নতুন করে আবারও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ইস্যুটি জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তিনি বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পদত্যাগ করতে চান। সে সময় তিনি আরও বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন।
এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, অন্যথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন।