সংগ্রাম ডেস্ক: উত্তেজনা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ বৈঠকগুলো একটি সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’র মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম দেওয়া পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তান আজ দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক সম্পন্ন করেছে। লেক লুসার্ন সম্মেলনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর বিষয়গুলোতে ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এক্সে, আনাদোলু এজেন্সি, দ্য টেলিগ্রাফ

তিনি আরও জানান, উভয় পক্ষই আগামী সময়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইয়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের পরপরই যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় খামেনেই নিহত হন। ইরানি গণমাধ্যম এখন তাদের প্রচারণার মূল মনোযোগ শেষকৃত্যের প্রস্তুতি। আগামী সপ্তাহের শোকমিছিল চলাকালীন দেশের কার্যক্রমে যেসব পরিবর্তন আনা হবে এবং এই বিশাল আয়োজনের প্রতীকী তাৎপর্যের ওপর নিবদ্ধ করেছে। তেহরানের প্রধান আলোচক ও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ সকল ইরানি নাগরিককে নেতার শেষকৃত্যে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইরানি সেনাবাহিনী শোকমিছিল চলাকালীন কোনো ধরনের ‘ভুল পদক্ষেপ’ বা ভুল হিসাব-নিকাশ না করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সতর্ক করে দিয়েছে।

মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তান এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ছিল ইতিবাচক এবং যত দ্রুত সম্ভব এই আলোচনা পুনরায় শুরু হবে। তবে দোহায় ঠিক কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা এখনো অস্পষ্ট। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তির অংশ হিসেবে তাদের অবরুদ্ধ সম্পদ বা অর্থ ছাড়ের বিষয়ে আলোচনার জন্যই তারা সেখানে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ‘অ্যাক্সিওস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানকে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছিলেন যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর মাশুল বা ফি আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। তবে আপাতত ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়বে, কারণ তারা খামেনেইকে সমাহিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আয়োজিত এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী মূলত সেই পক্ষগুলোর কাছেই নিজেদের টিকে থাকার সক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শন করতে চাইছে, যারা খামেনেইর মৃত্যুর জন্য দায়ী।

তেহরানের সঙ্গে আলাদা চুক্তির পথে উপসাগরীয় দেশগুলো

সাম্প্রতিক সংঘাতের পর বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির পথ খুঁজছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো।

আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তেহরানের সঙ্গে পৃথক সমঝোতা গড়ে তুলতে সক্রিয় হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যানুযায়ী, প্রথমে ইরান ও ওমান, এরপর ওমান ও কাতার, পরে ইরান ও সৌদি আরব এবং সবশেষে কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অঞ্চলে সহাবস্থান, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল শুরু হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে আরও বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের রূপরেখা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করবে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব

আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও পরিচালনা। বৈঠকগুলোতে আলোচনা হয়েছে, কীভাবে এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল পরিচালিত হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে কী ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারে। এদিকে, এসব আঞ্চলিক আলোচনা চললেও আলাদাভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আগস্টের শেষ নাগাদ একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমছে

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক গনুল তোল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা গত কয়েক বছর ধরেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তাই উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ইরানের সঙ্গে সরাসরি বোঝাপড়ায় পৌঁছানোই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।” তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী পৃথক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে।

প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে মিল: তবে প্রকাশ্যে এখনও উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকেই সমর্থন করছে।

সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক আঞ্চলিক বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীতে ‘অবাধ, শর্তহীন ও বাধাহীন নৌচলাচলের’ ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি কোনও ধরনের টোল, অতিরিক্ত ফি বা প্রণালীর ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা হয়। চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি বলেন, “হরমুজে নতুন কোনও টোল বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি লাল রেখা।”

ইরানের নতুন কৌশল: তবে কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ইরান সহজে হরমুজ প্রণালীকে তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ ছাড়বে না। জানা গেছে, এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে জাহাজ চলাচলের ওপর সরাসরি টোল নয়, বরং মাইন অপসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা কিংবা বীমা বাবদ ‘সেবা ফি’ আদায়ের ব্যবস্থা করা হতে পারে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোন সংস্থা দায়িত্ব নেবে বা অর্থ কীভাবে সংগ্রহ ও বণ্টন করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ইতোমধ্যে ইরান নবগঠিত গালফ স্ট্রেইট অথরিটির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজের জন্য ইরানি বীমা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান ৬০ দিনের অন্তর্বর্তী সময় শেষ হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর হাতিয়ার

গনুল তোলের ভাষায়, “ইরান এখন বুঝেছে, পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর একটি কৌশলগত হাতিয়ার তাদের হাতে আছে- সেটি হচ্ছে হরমুজ প্রণালী। ফলে তারা এমন কোনও ব্যবস্থা করবে, যাতে এই প্রণালীর ওপর তাদের প্রভাব বজায় থাকে।” তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হরমুজে কোনও ধরনের অতিরিক্ত ফি বা টোল আরোপ তিনি মেনে নেবেন না। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলের জন্য ফি আদায় নিষিদ্ধ। তবে জাহাজকে নির্দিষ্ট সেবা দেওয়া হলে সেই সেবার বিপরীতে অর্থ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

হামলার হুমকি ও উত্তেজনা: সম্প্রতি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজকে হুমকি দেয়। জাতিসংঘ, ওমান ও ইরানের সমন্বয়ে আটকে পড়া জাহাজ সরিয়ে নেওয়ার জন্য দু’টি নিরাপদ রুট নির্ধারণ করা হলেও ইরান জানিয়ে দেয়, নির্ধারিত রুট নিয়ন্ত্রণের একমাত্র কর্তৃত্ব তাদের এবং ওই পথের বাইরে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর একদিন পর তাইওয়ানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে হামলার শিকার হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের একটি ড্রোন ওই হামলা চালায়। অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির পর এটিই ছিল প্রথম এমন ঘটনা। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালায়, যার প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়েও পড়ে। পরে উভয় পক্ষ নতুন করে হামলা বন্ধে সম্মত হয় এবং কাতারে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেয়।

অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হতে পারে সমঝোতার হাতিয়ার

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের আর্থিক সক্ষমতা। যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক চাপে রয়েছে। তাই সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ধনী উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিনিময়ে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ কমানো এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হ্রাসের মতো বিষয়ে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করবে।

নিরাপত্তায় নতুন বিকল্পের খোঁজ: একসময় উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ছিল। কিন্তু বর্তমানে তারা বিকল্প অংশীদারও খুঁজছে। সম্প্রতি কুয়েত তুরস্কের সঙ্গে ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি করেছে। একইভাবে ইউক্রেন সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন রফতানির চুক্তি করেছে। এছাড়া সৌদি আরব মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে নতুন নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামো নিয়েও আলোচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র থাকবে, তবে একমাত্র ভরসা নয় বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রধান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। তবে তারা আর ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চাইছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। ফলে এখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিকল্প কৌশলও গ্রহণ করছে।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন নীতি হলো- যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকলে ভালো, কিন্তু না থাকলেও যেন নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। সেই লক্ষ্যেই তারা ‘প্ল্যান-বি’ ও ‘প্ল্যান-সি’ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ইরানের সঙ্গে সরাসরি আঞ্চলিক সমঝোতার পথ অনুসন্ধান করছে।