সপ্তম কিস্তি
চলতি জুলাই মাসের তিন তারিখে দৈনিক সংগ্রাম পাত্রিকার শেষ পৃষ্ঠার প্রথম কলামে নীচের দিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবাদলিপির প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১ জুলাই সংখ্যায় ‘জামায়াতের তুরস্ক কানেকশান এবং একাত্তরের পাপ’ শীর্ষক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সম্পাদক জনাব এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এই রিপোর্টের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। রিপোর্টের তিনটি অংশ। একটি হচ্ছে, বাংলাদেশের অন্যতম শিল্প উদ্যোক্তাগোষ্ঠী ও হালাল সাবানের প্রবক্তা এরোম্যাট সার্ভিসের চেয়ারম্যানের জামায়াতে যোগদান সংক্রান্ত। কসমেটিকস, টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও এক্সেসরিজ এবং প্যাকেজিং পণ্য তৈরি ও বিপণনের সাথে এই শিল্পগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা দীর্ঘকালের। কসমেটিক্স বিশেষ করে গায়ের সাবান তৈরির অন্যতম উপকরণ হিসেবে শুকরের চর্বি ব্যবহারের অভিযোগের আলোকে ইউনিলিভার, স্কয়ার টয়েলেট্রিজ এবং কোহিনূরের সাথে তাদের তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল এবং প্রতিষ্ঠানটি শূকরের চর্বির পরিবর্তে ভেজিটেবল ফ্যস্ট ব্যবহার করে হালাল পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেন। এর ফলে তারা অনেকেরই বিশেষ করে যারা হালাল হারামের তোয়াক্কা করেন না, ভূমিদস্য ও লুটেরা বলে পরিচিত তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হন। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকাটি বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানায় তাদেরই ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের একটি মুখপত্র। ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়াসহ বসুন্ধরা গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৪২,৭৫.০০০ কোটি টাকা, বকেয়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয় ঐ ধরনের ঋণ তো আছেই। পাঠকরা নিশ্চয়ই জানেন যে, বসুন্ধরা গ্রুপ পতিত স্বৈরাচার ও লুটেরা শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। এই গ্রুপ আওয়ামী লীগের ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রশংসায়’ রিপোর্টিংয়ের জন্য প্রতিটি জেলায় বছরে একটি করে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। নিজের ত্রুটি ঢাকার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে তারা বিরোধী রাজনীতিক ও শিল্পগোষ্ঠীসমূহের পেছনে লেগেছে। তাদের আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘টু পাইস’ কামানো। একজন শিল্পপ্রতি কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান করলেন তাতে পাত্রিকা বা জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের গাত্রদাহের কি কারণ থাকতে পারে।
পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকায় আমার একজন সিনিয়র সহকর্মী ছিলেন; স্পষ্ট করে তার নামই বলি, জনাব আতাউস সামাদ। তিনি সৌদি আরবকে দেখতে পারতেন না, প্রায়ই সৌদি আরেবের বিরুদ্ধে রিপোর্ট প্রকাশ করতেন। সম্ভবত ১৯৯৩ সালের দিকে রাজেন্দ্রপুরের ব্র্যাক সেন্টারে সিরডাপ (Center for Rural Development in the Asia Pacific) কর্তৃক আয়োজিত Poverty Alleviation সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালায় যোগদানের সুযোগ হয়েছিল। কর্মশিবিরের অংশ হিসেবে উদ্যোক্তা আমাদের মৎস্যচাষভিত্তিক একটি প্রকল্প পরিদর্শনে নিয়ে যান। প্রকল্পটি ছিল ব্র্যাক সেন্টারের উত্তর পার্শ্বে ময়মনসিংহ সড়কে পশ্চিম দিকে আফ্রিকান মাগুর মাছ চাষ প্রকল্প। সৌদী বিনিয়োগ কোম্পাানি সাবিন কো (SABIN Co)-এর অর্থায়নে প্রায় ৫০ একর জমির ওপর এ প্রকল্প গড়ে উঠেছিল। এর উদ্যোক্তা ছিলেন আমার অবজার্ভারের সেই বন্ধুবর। আতাউস সামাদ। পাঠকরা এখন বুঝুন সৌদীদের গালি দেয়া সাংবাদিকপ্রবর কিভাবে তার ভাগ্য গঠনে শত কোটি টাকার সৌদী তহবিল সংগ্রহ করেছেন।
তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের একটি শক্তিশালী দেশ। সে দেশটির সরকার বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের কী সম্পর্ক তা দিয়ে আমার আপনার কি? তাদের ধর্ম, কৃষ্টি, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের সাথে আমাদের অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক ছিল, আছে, থাকবে। তুরস্কের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো সারা দুনিয়ায় দুস্থ-দুর্গতদের পুনর্বাসন ও ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে নিরলসভাবে কাজ করে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে তাদের কাজ প্রশংসনীয়। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তৈয়ব এরদোগান ঘোষণা দিয়েই এই সাহায্য করে আসছেন যা এখনো অব্যাহত আছে। ঢাকায় তাদের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত তার্কিস হোপ স্কুল একটি অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি নিয়মকানুন মেনেই তারা বাংলাদেশে বিভিন্ন এতিমখানা প্রতিষ্ঠা ও এতিম প্রতিপালনে অর্থায়ন করছে যা বাংলাদেশ সরকারের Foreign DonationAct.-এর ধারা উপধারায় বর্ণিত বিধিবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। জামায়াতের সাথে যদি তুরস্ক সরকার অথবা সেই দেশটির ক্ষমতাসীন দলের সম্পর্ক থেকে থাকে তাতে কারো গা জ¦ালা করার মতো আমি কিছু দেখি না। এটা আসলে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের একটি ফন্দি। অতীতে এবং বর্তমানেও সাংবাদিক নামের অনেকেই সরকার ও বিদেশি এজেন্সিগুলো থেকে অবৈধ সুবিধা নেয় বলে বাজারে অনেক রটনা প্রচলিত আছে।
১৯৭১ সালের সামরিক সরকার জামায়াতের সরকার ছিল না। জেনারেল ইয়াহিয়ার সরকার ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সরকারেরই ধারাবাহিকতা ছিল। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা পূর্ব পাকিস্তান এসেম্বিলর ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে পূর্ব পাকিস্তান এসেম্বিলিতে ডিউটিরত অবস্থায় মাইকের ডান্ডা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার অজুহাতে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। হত্যাকাণ্ডটির জন্য আওয়ামী নেতারাই দায়ী ছিলেন। সামরিক শাসকদের ন্যায়-অন্যায় কোনো কাজের জন্যই জামায়াতকে দায়ী করা যায় না।
আমাদের দেশের দেশপ্রেমিক দলগুলোর কিছু সমস্যা আছে। তারা ঐক্যবদ্ধ নয়। তাদের মধ্যে কিছু কিছু দল ও নেতানেত্রী আছেন যারা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারেন না; ক্ষমতায় যাবার জন্য যেকোনো কাজ করতে পারেন। যারা নীতি-নৈতিকতা মেনে চলেন, বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সোচ্চার তাদের একটি অংশ Offensive ভূমিকার পরিবর্তে Defensiv ভূমিকায় বিশ্বাসী। রাজাকার ইস্যুটি এমন এক ইস্যু যা নিয়ে গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জামায়াতকে অপবাদ দিয়ে আসা হচ্ছে। অথচ স্বয়ং আওয়ামী শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ১০,০০০ রাজাকারের দলীয় সংশ্লিষ্টতার তথ্যে দেখা গেছে যে, এদের মধ্যে আট হাজারের বিশ আওয়ামী লীগের, এক হাজারের বেশি বিএনপি এবং মাত্র ৩৭ জন জামায়াত সমর্থিত।
গত কিস্তিতে রাজাকার বাহিনী সম্পর্কে আমি কিছু প্রামাণ্য তথ্য পেশ করেছি।
Terror in East Pakistan
এ কথাটা শুনে আনেকেই আঁৎকে উঠলেও পাাকিস্তানী সেনা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে তারা মুক্তি বাহিনীর একটা অংশ ছিল। ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতির ওপর পাকিস্তান সরকারের প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্রের কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। এই শ্বেতপত্রের চতুর্থ অধ্যায়ে ‘Terror in East
Pakistan’ শিরোনামে ৪৩নং অনুচ্ছেদে আওয়ামী লীগের Operational Plan সম্পর্কে নিম্নোক্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে-
East Bangal Regiment (EBR) troops would occupy Dacca, and chittagong to prevent the landing of pakistan Army by air or sea;
The remainig EBR troops with the help of East Pakistan Rifles (EPR) police and armed Razakars Would move to eleminate the armed forces at various cantonments and stations;
EPR would occupy all the key posts of the border and keep it open aid from outside (India);
Requirements of further arms and ammunition world be net from India ; and Indian troops would come to the assistance of the Awami League rebels forces once the latter succeeded in the first phase of occupying key centres and paralysing the pakistan Army.
অর্থাৎ ক) ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের দখল নেবে যাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আকাশ পথে বা সমুদ্র পথে নামতে না পারে।
খ) ইপিআর-এর অবশিষ্ট সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) পুলিশ এবং সশস্ত্র রাজাকারদের সহায়তায় বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট ও সেনা ইউনিটে হামলা করে পাকিস্তানী বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এগিয়ে যাবে;
গ) সীমান্তের সকল চৌকি ও পোস্টগুলো ইপিআর বিশেষ করে নেবে এবং বাইরের সাহায্য বিশেষ করে ভারতীয় বাহিনীর জন্য উন্মুক্ত রাখবে;
ঘ) অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের বাকী ও অতিরিক্ত চাহিদা ভারত থেকে পূরণ করা হবে এবং
ঙ) আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী বাহিনী পাকিস্তান বাহিনীকে অচল করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রসমূহ দখলের প্রাথমিক পরিকল্পনায় সাফল্য অর্জন করলে ভারতীয় বাহিনী তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে।
আওয়ামী লীগের উপরোক্ত অপারেশনাল প্ল্যানটি ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশকে বিদ্রোহের মাধ্যমে একটি শত্রু দেশের সহায়তায় আলাদা করে দেয়ার পরিকল্পনায় পাকিস্তান ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, পূর্ব পাকিস্তান তার একটি প্রদেশ।
এই প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের বশংবদ হবার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ আঘাত করার আগেই গভীর রাতে তাদের ওপর আঘাত হেনেছে। এর পরের ঘটনা সারা দুনিয়া অবহিত রয়েছে। যুদ্ধরত পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর মাঝখানে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ মরেছে, আহত ও সম্পদ-সম্পত্তি এবং সম্মান ও ইজ্জত হারিয়েছে। এর প্রাথমিক দায় তিন ব্যক্তির ওপর বর্তায়। শেখ মুজিবর রহমান, জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। তিনজনকেই অস্বাভাবিক মৃত্যু তাদের পাওনা মিটিয়ে দিয়েছে। এদের যদি মরণোত্তর বিচার হয় তাহলেও আইন ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমার যৎসামান্য জ্ঞান বলে দেয় যে তাদের পুনঃমৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অপরাধের বিচার এখনো বাকী আছে। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন বন্ধ। শেখ মুজিব হত্যায় কেউ ইন্না লিল্লাহ পড়েনি, তার বিরুদ্ধে ৫ জনের একটি মিছিলও হয়নি। তার ও তার দলের উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনার পলায়নে কোটি কোটি মানুষ উল্লসিত হয়েছে।
আমি আগেই বলেছি, এ দেশের লক্ষ লক্ষ লোক (বাঙ্গালী বিহারী তাদের মা বোনসহ) আওয়ামী লীগের হাতে নির্মমভাবে নিহত, আহত ও অঙ্গহারা হয়েছে; বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তারা ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে।
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিব দেশে ফেরার পর ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১৫ বলে ১৬ ডিসেম্বরের আগে ও পরে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ড জবর দখল ও বাড়াবাড়ির সাথে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী নেতাকর্মীদের ইনডেমনিটি প্রদান করে আদেশ জারি করেন এবং ১৬নং আদেশ বলে জবরদখলকৃত সকল বাড়িঘর, কলকারখানা ও সহায়সম্পদকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি ঘোষণা করে তার মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করেন।
গত কিস্তিতে পূর্ব পাকিস্তান সরকারে গোয়েন্দা বিভাগের পাক্ষিক রিপোর্টের বরাত দিয়ে ৩-১০-৭১ তারিখে জামায়াতের নাখালপাড়া দফতরে অধ্যাপক গোলাম আযমের সভাপতিত্বে তিন দিনব্যাপী মজলিসে শূরা বৈঠক শুরু হবার কথা বলেছিলাম। এ বৈঠকে অধ্যাপক গোলাম আযম পাকিস্তান ও তার আদর্শ রক্ষায় সক্রিয় হবার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। সম্মেলনে আসন্ন উপনির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয় এবং দলীয় প্রার্থী বিবেচনার জন্য অধ্যাপক গোলাম আযমকে সভাপতি ও মাওলানা শফিউল্লাহকে সেক্রেটারি করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই সম্মেলনে পিডিএম-এর ৮ দফার ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনেরও দাবি জানান হয়। অক্টোবর মাসের ৯ তারিখে অধ্যাপকত গোলাম সারওয়ারের সভাপতিত্বে ঢাকা মহানগরী জামায়াতের এক সভায় ইসলামী মূলনীতির ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্যদূরীকরণ, জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ সরকারের সকল দফতরে জনবল নিয়োগের দাবি জানানো হয়।
জুলাই মাসের প্রথম দিকে জামালপুর জেলা সদরে ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ছাত্রসংঘের সভাপতি মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের ধ্বংসাত্মক তৎপরতার নিন্দা করেন এবং দেশের অখণ্ডতা রক্ষার কাজে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। ১৭-৭-৭১ তারিখে রংপুর টাউন হলে জনাব এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে সংগঠিত থাকার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ১৮-১০-৭১ তারিখে বগুড়ায় ছাত্রসংঘের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বক্তব্য রাখেন এবং দেশ রক্ষার কাজে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য জনসাধারণ ও ছাত্রসমাজকে পরামর্শ দেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে ১৯৭১ সালে জামায়াতের সামগ্রিক তৎপরতায় আমি কোথাও উশৃঙ্খল আচরণ বা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা বা এমনকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও নিশ্চিহ্ন করার কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে আমি দেখিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক জামায়াতের পাবলিসিটি সেক্রেটারি জনাব নূরুজ্জামান সিলেটের একটি নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত হওয়ায় আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযমের নির্দেশে পাবলিসিটির কাজ দেখা শোনার ভার আমার ওপর অর্পিত হয়েছিল এবং এ সুযোগে তৎকালীন জামায়াতকে অত্যন্ত কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে আমার কোনও বিভ্রান্তি নেই। দলটি তার দেশপ্রেমের ঈমানী অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়নি। তার সততা, একাগ্রতা, শক্ত নৈতিক বল বিশেষ করে আল্লাহর ওপর আস্থা বিশ্বাসই তাকে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের ঝড়ঝাপটা কাটিয়ে উঠে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে একটি যুদ্ধ হয়েছে এবং এই যুদ্ধের অনুঘটকরা এক শ্রেণীর মানুষের রক্তের মধ্যে জামায়াত বিরোধী অনেকগুলো বিষ ঢুকিয়েছে যা আগামী দিনগুলোতেও বংশানুক্রমিকভাবে তার ক্রিয়া অব্যাহত রাখবে। জামায়াতকে এ ব্যাপারে সতর্কভাবে সামনে অগ্রসর হতে হবে। শেষ করার আগে পাঠক পাঠিকা ও দেশবাসীকে আমি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অন্যতম নায়ক স্যার উইনস্টন চার্চিলের একটি উক্তি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘Grass doesn’t grow under gallows but grows then on a battlefied.’ অর্থাৎ ফাঁসির মঞ্চে কখনো দূর্বাদল গজায় না কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর রণক্ষেত্র আবার সবুজ হয়ে ওঠে।