॥ মোঃ রাশেদুল হাসান আমিন ॥

সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। বিস্তৃত এ পৃথিবীর কোনো এক কোনে অবস্থিত একটি শরণার্থী শিবিরে কয়েকটি শিশু এক তাবু থেকে আরেক তাবুতে ছুটোছুটি করছে। তাদের স্মৃতিতে কোনো মানচিত্র বা পতাকা নেই। কারো জন্ম হয়তো কোন এক গ্রামে আবার কারো হয়তো এই শরণার্থী তাবুতেই। যে শহর বা গ্রাম থেকে তারা পালিয়ে এসেছে, হয়তো আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে; যে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল, সেটি এখন ধ্বংসস্তূপ। কারো বাবা নেই তো কারো মা; আবার করো বাবা-মা কেউই হয়তো নেই, সে জানে না। প্রতিদিন তারা লাইনে দাঁড়িয়ে এক থালা খাবারের আশায় যুদ্ধ করে, অপেক্ষা করেÑ আজ অন্তত একটি পূর্ণবেলা খাবার মিলবে। তাদের পরিচয় এখন কেবল একটি নিবন্ধন নম্বর; ঠিকানা অস্থায়ী তাঁবু; আর ভবিষ্যৎ, সে তো অনিশ্চয়তার আরেক নাম।

এসব শিশুরা কোনো একটি দেশের একক গল্প নয়। তারা হতে পারে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা, গাজার ধ্বংসস্তূপে বেড়ে ওঠা ফিলিস্তিনী, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের কোনো কিশোর, সুদানের সংঘাত থেকে পালানো একটি পরিবার কিংবা সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের আরো কিছু নীরব মুখ। ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূগোল ভিন্ন হলেও তাদের যন্ত্রণার ভাষা একÑ নিজ ভূখ-ে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার হারানো।

একটি শিশুর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা তার নিজের ঘর। কিন্তু পৃথিবীর কোটি কোটি শিশুর কাছে সে ঘর এখন শুধু স্মৃতি। জন্মভূমির মাটি, শৈশবের উঠোন, প্রতিবেশীর মুখ কিংবা বিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনিÑ সবকিছুই তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। যুদ্ধ, নির্যাতন কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতা তাদের এমন এক জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে আগামীকালও অনিশ্চিত। আজকের বিশ্বে শরণার্থী সংকট কেবল মানবিক বিপর্যয়ের নাম নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেও মানবসভ্যতা এখনো কোটি কোটি মানুষকে একটি নিরাপদ ঠিকানা নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, জাতিগত নিধন, ধর্মীয় নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শরণার্থী সৃষ্টি করছে।

আন্তর্জাতিক আইনে শরণার্থী হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি জাতিগত পরিচয়, ধর্ম, জাতীয়তা, রাজনৈতিক মতাদর্শ অথবা নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণে নির্যাতনের আশঙ্কায় নিজ দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এবং নিজ দেশের সুরক্ষা গ্রহণে অক্ষম বা অনিচ্ছুক। এ সংজ্ঞা শুধু একটি আইনি পরিচয় নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ঘর হারানোর অসংখ্য ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি। তবে শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি (আইডিপি) ও রাষ্ট্রহীন মানুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কেউ সীমান্ত অতিক্রম করেন, কেউ নিজ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হন, আবার কেউ এমন অবস্থায় পড়েন যে কোনো রাষ্ট্রই তাকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। কিন্তু সবার মধ্যে একটি মিল রয়েছেÑ নিরাপত্তাহীনতা এবং মৌলিক অধিকারের সংকট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্বকে শিখিয়েছিল, রাষ্ট্র যখন নিজ নাগরিককে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব শুরু হয়। সেই উপলব্ধি থেকেই ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন এবং ১৯৬৭ সালের প্রটোকল গৃহীত হয়। এর অন্যতম মৌলিক নীতি হলোÑ কোনো শরণার্থীকে এমন দেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের এই নীতি আজও শরণার্থী সুরক্ষার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থ ও সীমান্তনীতির কাছে এই আদর্শ দুর্বল হয়ে পড়ে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বাস্তুচ্যুত মানুষের গল্প নতুন নয়। সাম্রাজ্যের পতন, ধর্মীয় সংঘাত কিংবা দুর্ভিক্ষ বহু মানুষকে ঘরছাড়া করেছে। তবে আধুনিক শরণার্থী সংকটের ভিত্তি গড়ে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। যুদ্ধ শেষে ইউরোপজুড়ে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এরপর শীতল যুদ্ধ, উপনিবেশমুক্তি, আফ্রিকা ও এশিয়ার স্বাধীনতা-সংগ্রাম, বলকান যুদ্ধ, রুয়ান্ডার গণহত্যা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বকে বারবার নতুন শরণার্থী সংকটের মুখোমুখি করেছে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে সংকটের ধরণ আরও জটিল হয়েছে। এখন শুধু যুদ্ধ নয়; রাষ্ট্রের ভাঙন, দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট এবং পরাশক্তির প্রক্সি সংঘাতও মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার বড় কারণ। অনেক অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, পানির সংকট বাড়ছে, জীবিকা হারিয়ে মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক আইনে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতদের এখনো শরণার্থীর আনুষ্ঠানিক মর্যাদা দেয়া হয়নি, ভবিষ্যতে এই সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকটগুলোর দিকে তাকালেই এ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা দশকের পর দশক ধরে নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের পর লাখো রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আজও তাদের অধিকাংশের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ খুলে যায়নি।

ফিলিস্তিনের বাস্তুচ্যুত মানুষের ইতিহাস সাত দশকেরও বেশি পুরোনো। একাধিক যুদ্ধ, দখল, অবরোধ এবং সহিংসতার ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শরণার্থী শিবিরে বেড়ে উঠেছে। একইভাবে সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ কোটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিপর্যস্ত করেছে। ইউক্রেনে যুদ্ধ ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অন্যতম বৃহৎ বাস্তুচ্যুতি সৃষ্টি করেছে। সুদান, আফগানিস্তান, গণতান্ত্রিক কঙ্গো, ইয়েমেন এবং ভেনেজুয়েলার সংকটও দেখিয়েছে যে, যুদ্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে পারে।

শরণার্থী হওয়া মানে কেবল সীমান্ত অতিক্রম নয়; এর অর্থ একটি পরিচয়, একটি সামাজিক সম্পর্ক এবং একটি ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলা। শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী পরিবারগুলো প্রায়ই বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটায়। খাদ্য সহায়তা কমে গেলে অপুষ্টি বাড়ে, বিশুদ্ধ পানির অভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ে, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় শিশুরা, নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, আর তরুণদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে; যুদ্ধ, স্বজন হারানো এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা অনেককে আজীবনের মানসিক আঘাত দিয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিশুদের। তারা এমন এক পরিবেশে বড় হয়, যেখানে দেশ বলতে কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই; আছে শুধু বাবা-মায়ের স্মৃতি আর কাঁটাতারের ওপারের অদেখা একটি ভূখ-ের গল্প। একটি প্রজন্ম যদি শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক শৈশব থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সেই ক্ষতি কেবল একটি পরিবারের নয়; সমগ্র মানবসমাজের।

এমন বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শরণার্থী সংকট কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। এটি সীমান্ত অতিক্রম করে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। তাই এ সংকটের সমাধানও কেবল ত্রাণ বিতরণ বা আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সংঘাতের মূল কারণগুলো দূর করার আন্তরিক উদ্যোগ।

বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের অন্যতম ভার বহন করছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে লাখো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সীমিত সম্পদ ও জনঘনত্বের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় তাদের আশ্রয় দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সাত বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর স্পষ্ট হয়েছে, একটি সাময়িক মানবিক সংকট ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজার ও আশপাশের অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতি, অবকাঠামো, পরিবেশ ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। বনভূমি উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকট আজ শুধু মানবিক ইস্যু নয়; এটি উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ একা এ সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে পারে না। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টি না হলে কোনো শরণার্থী সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। আর সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রধানত সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। এখানেই সামনে আসে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা। জাতিসংঘ, শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রসের মতো প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, আশ্রয় এবং আইনি সহায়তা প্রদানে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, মানবিক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা প্রায়ই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো, পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং অর্থায়নের সংকট বহু ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে যেখানে দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় বছরের পর বছর কেবল মানবিক সহায়তাই চলতে থাকে।

বিশ্ব রাজনীতির আরেকটি বড় দ্বন্দ্ব হলোÑ মানবাধিকার বনাম জাতীয় নিরাপত্তা। উন্নত বিশ্বের বহু দেশ মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার হলেও বাস্তবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে। অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি অনেক দেশের নীতি আগের তুলনায় কঠোর হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ, জর্ডান, লেবানন, উগান্ডা বা চাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো সীমিত সম্পদ নিয়েই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। এই বৈষম্য বৈশ্বিক দায়িত্ব বণ্টনের প্রশ্নকে আরও জোরালো করে।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ কোটিরও বেশি। এর মধ্যে প্রায় চার কোটি আন্তর্জাতিক শরণার্থী, সাত কোটিরও বেশি নিজ দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের আবেদন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করছেন। সিরিয়া, সুদান, আফগানিস্তান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও ভেনেজুয়েলা বর্তমানে বাস্তুচ্যুত মানুষের সবচেয়ে বড় উৎস দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা এবং একটি অসমাপ্ত জীবনকাহিনি।

তাহলে সমাধানের পথ কোথায়?

প্রথমত, শরণার্থী সংকটের মূল কারণÑ যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, জাতিগত নিধন এবং রাজনৈতিক নিপীড়নÑ বন্ধ না হলে কোনো মানবিক সহায়তাই স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। তাই সংঘাত প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক কূটনীতি আরও কার্যকর হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং মানবিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দায়মুক্তির সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন নতুন নতুন শরণার্থী সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে।

তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনকে অবশ্যই নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে। জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো কখনোই টেকসই সমাধান নয়। যেখানে প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন সম্ভব নয়, সেখানে স্থানীয়ভাবে একীভূতকরণ বা তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগও সম্প্রসারণ করতে হবে।

চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালায় এই নতুন বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরণার্থী সংকটকে কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে নয়; শান্তি, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে। কারণ একটি যুদ্ধের প্রভাব কখনো একটি দেশের সীমান্তে আটকে থাকে না; তার অভিঘাত প্রতিবেশী অঞ্চল, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, এমনকি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ে।

শরণার্থী সংকট আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন মানুষ মহাকাশ অভিযানের নতুন ইতিহাস লিখছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জটিল সমস্যার সমাধান করছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করছে। অথচ একই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ আজও নিরাপদে ঘুমানোর একটি ঘর পায় না। এ বৈপরীত্যই আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন।

শরণার্থী কোনো বোঝা নয়; তারা এমন মানুষ, যাদের জীবন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ এবং সহিংসতার কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে। তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো দয়া নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং সভ্যতার মৌলিক দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত একটি সত্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণÑ কেউ স্বেচ্ছায় শরণার্থী হয় না। কেউ নিজের জন্মভূমি, পূর্বপুরুষের কবর, শৈশবের স্মৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়াতে চায় না। মানুষ তখনই ঘর ছাড়ে, যখন ঘর আর নিরাপদ থাকে না। তাই শরণার্থী সংকটের স্থায়ী সমাধান শরণার্থী শিবিরে নয়; তার সমাধান যুদ্ধের অবসানে, ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠায়, মানবাধিকারের সুরক্ষায় এবং এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলায়, যেখানে কোনো মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য নিজের দেশ ছেড়ে পালাতে না হয়।

মানবসভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ অন্তত একটি নিশ্চয়তা পাবেÑ নিজের ঘরে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার। কারণ শরণার্থী কোনো পরিসংখ্যান নয়; তারা আমাদেরই মতো মানুষ, যাদের সবচেয়ে বড় আকাক্সক্ষা কেবল একদিন নিজের ঘরে, নিজের মাটিতে, মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়া।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।