সংঘাত, আলোচনা; আবারও সংঘাত, অতঃপর আলোচনা-ইরান যুদ্ধের এমন চালচিত্র কি বার্তা দিচ্ছে পৃথিবীকে? অবিশ্বস্ত এই বিশ্বব্যবস্থায় আস্থার সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। বিশ্বটা আর মানবিক নেই, ন্যায়-নীতি ও উচ্চতর মূল্যবোধ নির্বাসিত। এক আণবিক জঙ্গলে এখন মানুষের বসবাস। মারণাস্ত্র এখন ঝলমলে জঙ্গলের শাসক। কোথাও আবার মিনমিন করে উচ্চারিত হচ্ছে মাৎস্যন্যায়ের প্রলাপ। তাই দিনশেষে মাথায় হাত দিয়ে বলতে হয়-এতো বিজ্ঞান-প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কি করবো? এতো কূটনীতিক ও বন্ধুত্বের প্রহসন আমাদের কোন কাজে লাগছে? একটু স্বাধীনভাবে আপন জনপদের ফুল-ফসলে তুষ্ট থাকতে এতো বাধা কেন? মানুষকে দাস বানাবার, কারাগারে বন্দী করার এ কেমন ‘বিশ^ব্যবস্থা’ আধুনিক সভ্যতায়? মানবের এমন করুণ অবস্থার শুরুটা হয়েছিল কিন্তু ইউরোপীয় রেনেসাঁর উচ্চ নিনাদে। রেনেসাঁর নেতারা যখন রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে মহান স্রষ্টাকে উৎখাত করে মানবের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করলো, তখন অনেকেই ক্ষুদ্র স্বার্থের অর্বাচীন প্রভু হয়ে উঠলেন। মাথাব্যথার জন্য যারা মাথা কেটে ফেলার বিধান দেন, ধর্মযাজকদের মূর্খতা ও ভণ্ডামির কারণে যারা মহান প্রভুকে দণ্ড দেন, তাদের অস্থির আদালতে মানব ও বিশ্বমুক্তির বার্তা থাকবে কেমন করে? এদের ভ্রান্ত ভাবনায় ভালো-মন্দের মিশ্রণ দেখলাম। তবে সৃষ্টিতত্ত্ব ও মৌলিক ভাবনায় গলদ থাকায় ‘পরিবর্তনের নেতারা’ মানবজাতিকে দিশা দিতে সক্ষম হননি। ইউরোপীয় রেনেসাঁর পর শিল্পবিপ্লব তো হলো, কিন্তু Pursuit of materialism রোখার নৈতিকতা তো তারা প্রদর্শন করতে পারলেন না। ফলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতা নবনব উদ্ভাবন ও উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হলেও তা মানব জাতির কল্যাণ সাধনে সমর্থ হলো না। বরং রাজনীতি ও সমরনীতির মাধ্যমে কিছু মানুষ, কিছু দেশ, পুরো পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলো। তাদের এমন আগ্রাসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো মানুষও তেমন রইলো না। কারণ ‘পারসুট অব ম্যাটেরিয়ালিজম’ মানুষকে অর্থ ও সম্পদের পেছনে পাগলের মত দৌড়াতে আসক্ত করে তুলেছিল। তাদের বিবেচনার ভুবন থেকে ন্যায়-অন্যায়, নীতি-নৈতিকতা অপসৃত হলো। অর্থ-সম্পদই তাদের Love এবং God হয়ে উঠলো। এমন সভ্যতায় যা হবার তা-ই হলো। মহান স্রষ্টা মানববান্ধব করে যে পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন, তা ক্রমেই মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। নীতিভ্রষ্ট নেতাদের আচরণে যে ‘আস্থাহীনতার সংকট সৃষ্টি হলো, সে পথে সংঘটিত হলো প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ। এখন আমরা তৃতীয় বিশ^যুদ্ধের এক অনাকাক্সিক্ষত পরিবেশে আছি, যদিও কৌশলগত কারণে মাঝে মাঝে ‘যতি’ লক্ষ্য করা যায়। ভূরাজনীতি ও শিল্পরাজনীতির ভ্রষ্টতায় শুধু মানুষ নয়; জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতি সবই আছে মহাবিপদে। জলবায়ু সংকট নিয়ে কথা হয়, সমাধান হয় না। জ¦ালানি আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে, সাথে পানিও। এসব সংকটের সমাধান আছে, তবে সমাধানের জন্য যে ন্যায় ও নৈতিকতাবোধ প্রয়োজন- তা বর্তমান সভ্যতার শাসকদের মধ্যে নেই। স্বার্থান্ধ শাসকরা ক্ষুদ্র প্রভু সাজার চেষ্টা করলেও মহান প্রভুর আলোচিত পথের অভিযাত্রী হওয়ার সামর্থ্য তারা রাখেন না। ফলে ভ্রান্তনীতির ভ্রষ্ট শাসকরা পৃথিবীকে আর এক মহাযুদ্ধের বিপদে ফেলেছে। ইরান যুদ্ধ তার এক বড় প্রমাণ।
শান্তিচুক্তির মধ্যেই টানা দু’দিন পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে আমেরিকা ও ইরান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্য জাহাজে আক্রমণের অজুহাতে ইরানের ভূখণ্ডে আঘাত হানে আমেরিকা। এর জবাবে পারস্য উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন ও কুয়েতে আমেরিকার ঘাঁটিতে হামলা চালায় তেহরান। শুক্রবার রাত থেকে শুরু হওয়া এ সংঘাত বন্ধ করে নতুন করে দুই দেশের আলোচনায় বসার কথা শোনা যাচ্ছে। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে জানান, মঙ্গলবার ইরানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কাতারের দোহায় বৈঠক হবে। ওই পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইরান বৈঠকের জন্য অনুরোধ করেছে। এটি মঙ্গলবার দোহায় অনুষ্ঠিত হবে।’ তবে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি সপ্তাহে এ ধরনের কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই।
দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে কোনো রকম টেকনিক্যাল বৈঠকের দিন নির্ধারিত নেই।’ বৈঠকের বিষয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান বিশ^ব্যবস্থায় ‘আস্থার সংকট’ বেশ বড় হয়ে উঠেছে। এখন চুক্তির পরও যুদ্ধ হয়। নেতা বা রাষ্ট্রের কথার দাম নেই, চুক্তিরও দাম নেই। মানহীন, নীতিহীন এ বিশ^ব্যবস্থা আর কতদিন চলবে?
তিন মাসের বেশি চলতে থাকা ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সংঘাত বন্ধে গত ১৭ জুন দুই দেশের প্রেসিডেন্ট শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৪ দফা শর্তের এ চুক্তির পঞ্চম দফায় উল্লেখিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচলের বিষয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে। শর্তে বলা হয়েছে, ‘ইরান তার সর্বোচ্চ সামর্র্থ্য দিয়ে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে ৬০ দিনের জন্য কোনো প্রকার অর্থ বিনিময় ছাড়াই বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে।’ আর ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানেরই নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ইরানের নির্দেশ অনুসারেই এ সমুদ্র সংযোগ পথ দিয়ে যে কোনো নৌযান চলাচল করবে। অপরদিকে আমেরিকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চুক্তির শর্ত অনুসারে এ পথ দিয়ে কোনো বিপত্তি ছাড়াই সব ধরনের নৌযান চলাচল করবে। উপলব্ধি করা যায়, চুক্তির পরও তাঁদের বক্তব্যে কিছুটা রকমফের লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আসলে শান্তিচুক্তি বলতে মানুষ যা বোঝে, তার অস্তিত্ব বর্তমান বিশ^ব্যবস্থায় নেই। এ কারণেই শান্তিচুক্তির পরও আমরা দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘাটনা লক্ষ্য করলাম।
আমরা জানি, ইরান যুদ্ধের আসল ইন্ধনদাতা ইসরাইল, আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইসরাইলের ফাঁদে পা না দিলেও ট্রাম্প দিয়েছেন এবং ফেঁসে গেছেন। বিষয়টি এখন ভালো করেই জানেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও। ফলে ইসরাইলের প্রতি তাদের বিতৃষ্ণার মাত্রা বাড়ছে। বিতৃষ্ণা ও বিরূপ মনোভাবের বিষয়টা মার্কিন তরুণদের মধ্যে বেশ স্পষ্ট। এমন কি রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকদের মধ্যে এই মনোভাব অনেক বেশি। ফলে রিপাবলিকান পার্টির ইসরাইলের প্রতি দীর্ঘদিনের নিঃশর্ত সমর্থন ভবিষ্যতে আগের মত থাকবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মেরিল্যান্ড বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোলের পরিচালক এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শিবলি তেলহামি বলেন, ‘তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই কিছু একটা দানা বাঁধছে।’ মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ইসরাইলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধে জড়ানোর ঘটনা রিপাবলিকানদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষের মাত্রা বাড়িয়েছে। গত এপ্রিল মাসে পিউরিসার্চ সেন্টারের করা এক জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের ৪০ শতাংশই এখন ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইসরাইলকে আর ব্যক্তিক্রমী মিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে না। একই সময় নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরাইল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও জনমতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরাইলের উদ্বেগ বাড়ছে। আর পলিটিকোর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগও কমেছে। ২০২৫ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পাঁচবার ওয়াশিংটন সফর করলেও ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মাত্র একবার সেখানে গেছেন। নেতানিয়াহুর আরেকটি হোয়াইট হাউস সফরের আপাতত কোনো কর্মসূচি নেই। পলিটিকোর মতে, সবচেয়ে খারাপ সময় আসা এখনো বাকি আছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, ২ জুন টেলিফোনে কথা বলার সময় ইসরাইলের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেন ট্রাম্প। পরে ট্রাম্প নিজেই নিশ্চিত করেন- ওই আলাপে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘ড্যামড ম্যাডম্যান’ বা বদ্ধ উন্মাদ বলে উল্লেখ করেছেন। এসবই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক অবনতির বিবরণ। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে সম্পর্ক অবনতির বয়ান। তবে এখানে প্রশ্ন আছে, শুধু নেতানিয়াহুই কি বর্তমান বিশ^ব্যবস্থায় একমাত্র ‘ড্যামড ম্যাডম্যান’?
বয়ান, বিবরণ ও প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক অবনতির তথ্য পাওয়া গেল। তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কোনো বিষয় টেকসই হতে হলে সেখানে সঙ্গত একটা ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। ‘জ্ঞান’ ও ‘ন্যায়’ ছাড়া কোনো সঙ্গত ভিত্তি রচিত হতে পারে কী? তাই জ্ঞান ও ন্যায়বিহীন মার্কিন-ইসরাইল জোটের ধস শুধু সময়ের অপেক্ষায় ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও, তা পৃথিবীর সবকিছু নয়। পৃথিবীর বিষয় আরো বড়, আপন আপন দেশের পরিস্থিতিও আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইতিহাস ও সভ্যতার আলোকে সামগ্রিক বিষয়ে সঙ্গত ভূমিকা পালন করতে হলে বর্তমান সময়ে প্রয়োজন মৌলিক সিদ্ধান্ত- আর নয় কোনো ক্ষুদ্র মানবপ্রভু, বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান প্রভুর বিধানের আনুগত্যই মানবের কর্তব্য এবং সেখানেই রয়েছে মানবজাতির মুক্তি ও সমৃদ্ধি। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনের বার্তা মানুষ ভুলে গেল কেমন করে?