একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিদ্যুৎ মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কিন্তু যখন সে বিদ্যুৎই মানুষের জীবনের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তখন তা কেবল একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না বরং প্রশ্ন ওঠে অবকাঠামোর নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণের মান, দায়িত্বশীলতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে। সম্প্রতি দেশের দুটি জেলায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের তিন সদস্য এবং অন্য ঘটনায় এক দম্পতির মর্মান্তিক মৃত্যু জাতিকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে। একটি পরিবার মুহূর্তেই তাদের আপনজন হারিয়েছে, আরেকটি পরিবারে শিশু সন্তানকে বয়ে বেড়াতে হবে বাবা-মাকে একসঙ্গে হারানোর অসহনীয় স্মৃতি। এ ধরনের মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। বর্ষা মৌসুম এলেই ছিঁড়ে পড়া বৈদ্যুতিক তার, ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ, ত্রুটিপূর্ণ ট্রান্সফরমার কিংবা অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ অবকাঠামোর কারণে প্রাণহানির খবর প্রায়ই সামনে আসে। কিছুদিন আলোচনা হয়, তদন্তের ঘোষণা আসে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। এরপর আবার নতুন কোনো দুর্ঘটনা আমাদের একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিরোধযোগ্য। নিয়মিত পরিদর্শন, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ সঞ্চালন লাইন সময়মতো প্রতিস্থাপন, ঝুলে থাকা বা ক্ষতিগ্রস্ত তার দ্রুত মেরামত, নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে বহু প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে এটি কেবল প্রকৃতির খেয়াল নয়; অবহেলা, দুর্বল তদারকি কিংবা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিটি প্রাণহানির ঘটনার পর একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কেবল ক্ষতিপূরণ ঘোষণা বা শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়; ঘটনার প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো সংস্থা, কর্মকর্তা, ঠিকাদার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাঁর কর্তব্য পালনে গাফিলতি করেছেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত না হলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিরও বিকল্প নেই। অনেক সময় মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, খোলা তার কিংবা ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় দুর্ঘটনার শিকার হন। স্কুল, কলেজ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণা চালানো যেতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালে বিদ্যুৎসংক্রান্ত সতর্কতা নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। বিদ্যুৎ খাতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে হয়েছে। কিন্তু সম্প্রসারণের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন লাইন স্থাপন যতটা জরুরি, পুরোনো লাইন নিরাপদ রাখা তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি অবহেলিত বৈদ্যুতিক খুঁটি, একটি ক্ষতিগ্রস্ত তার কিংবা একটি ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের সব সুখ-স্বপ্ন শেষ করে দিতে পারে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া নয়; নিরাপদ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাও। তাই সারা দেশে বৈদ্যুতিক সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার একটি সমন্বিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা এখন সময়ের দাবি। কোথায় কোথায় ঝুঁকিপূর্ণ লাইন রয়েছে, কোন এলাকায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন এবং কোথায় নিরাপত্তা মান লঙ্ঘিত হচ্ছে, তার একটি বাস্তবভিত্তিক তালিকা তৈরি করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। তবু রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব হলো তাদের পাশে দাঁড়ানো, আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবার একইভাবে শোকের ভার বহন করতে না হয়, সে নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমরা যদি শুধু শোক প্রকাশ করে থেমে যাই, তবে এ শোকের পুনরাবৃত্তি থামবে না। এখন সময় এসেছে বিদ্যুৎ নিরাপত্তাকে কেবল একটি কারিগরি বিষয় হিসেবে নয়, জননিরাপত্তা ও জনজীবনের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করার। কারণ একটি নিরাপদ বিদ্যুৎব্যবস্থা কেবল উন্নয়নের সূচক নয়, এটি মানুষের জীবন রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।