আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এর অংশ হিসেবে কুষ্টিয়া শহরকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করা হয়েছিল, যার সুফল পাচ্ছিলেন কুষ্টিয়াবাসী। কুষ্টিয়া শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম ভরসাও হয়ে উঠেছিল এই সিসিটিভি নেটওয়ার্ক। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, ব্যস্ত সড়ক ও জনসমাগমস্থলে স্থাপিত ৬৪টি ক্যামেরা পুলিশের অপরাধ দমন ও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে এসব ক্যামেরা অচল থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা এবং বাড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে জেলা পুলিশের উদ্যোগে শহরের থানার মোড়, মজমপুর গেট, বড়বাজার, এনএস রোড, কোর্টপাড়া, কাস্টমস মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রথম পর্যায়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। পরে বারখাদা ত্রিমোহনী থেকে বটতৈল পর্যন্ত আরও ৪১টি স্থানে নতুন ক্যামেরা বসানো হয়। সর্বমোট ৬৪টি ক্যামেরার মাধ্যমে জেলা গোয়েন্দা শাখার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনে সফলতা পেয়েছিল পুলিশ।

তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় অধিকাংশ ক্যামেরা ভাঙচুরের শিকার হয়। অনেক স্থানে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আবার কিছু স্থানে ক্যামেরা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো সেগুলো মেরামত বা পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

কুষ্টিয়া শহরের বাসিন্দা শিহান উদ্দিন বলেন, "কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন জায়গা ক্যামেরার আওতায় থাকায় অপরাধীরা অন্যায় কাজ করতে ভয় পেত। এখন সেই নজরদারি না থাকায় সন্ধ্যার পর চলাচলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে।"

বড়বাজারের ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল বলেন, "আমাদের দোকানপাটে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়। সরকারি সিসিটিভি সচল থাকলে ব্যবসায়ীরা বাড়তি নিরাপত্তা অনুভব করেন। এখন কোনো ঘটনা ঘটলে প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।"

এনএস রোড এলাকার আরেক ব্যবসায়ী মো. শাহীন জানান, "শুধু ব্যক্তিগত ক্যামেরার ওপর নির্ভর করে পুরো শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে সরকারি সিসিটিভি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।"

শহরবাসীর অভিযোগ, সিসিটিভির নজরদারি না থাকায় ছিনতাই, চুরি, মাদক কারবার, মোটরসাইকেল চুরি ও বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকি বেড়েছে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের ক্যামেরার ফুটেজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ এবং সব সময় পর্যাপ্ত তথ্যও পাওয়া যায় না।

সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি খলিলুর রহমান বলেন, "বর্তমান সময়ে শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সিসিটিভি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে না, বরং তদন্তে নির্ভরযোগ্য আলামত হিসেবেও কাজ করে। তাই দ্রুত অচল ক্যামেরাগুলো মেরামত অথবা আধুনিক প্রযুক্তির নতুন ক্যামেরা স্থাপন করা প্রয়োজন।"

জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অচল হয়ে পড়া ক্যামেরাগুলো মেরামত কিংবা নতুন করে স্থাপনের জন্য এখনো প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন অপরাধের তদন্তে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন বলেন, "শহরের সিসিটিভি ব্যবস্থা পুনরায় সচল করার বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত মেরামত বা নতুন ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে অপরাধ তদন্তে ব্যক্তিগত সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করা হচ্ছে।"

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় সিসিটিভি শুধু নজরদারির মাধ্যম নয়, বরং স্মার্ট পুলিশিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুষ্টিয়ার মতো জেলা শহরে এ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন অচল থাকায় অপরাধ দমন ও তদন্তে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে অচল থাকা শহরের ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা এখন শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যাই নয়, বরং নগর নিরাপত্তার জন্য বড় এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জননিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে সিসিটিভি নেটওয়ার্ক পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের নাগরিক।