বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই স্নায়ুর চূড়ান্ত পরীক্ষা, আর আর্জেন্টিনা মানেই খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর অবিশ্বাস্য রূপকথা| আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে ঠিক এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর রোমাঞ্চের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব| প্রথমার্ধের পেনাল্টি মিসের হতাশা আর ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার চরম বিপর্যয় কাটিয়ে, চার মিনিটের জাদুকরী ঝড় আর এনজো ফার্নান্দেজের শেষ মুহূর্তের গোলে মিসরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা| সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ এখনও চূড়ান্ত হয়নি| শেষ ষোলোর সর্বশেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে কমম্বিয়া-সুইজারল্যান্ড| ওই ম্যাচের জয়ী দলই হবে আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনাল প্রতিপক্ষ| ম্যাচটি শুরু হবে ১২ জুলাই রোববার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায়|
কেপ ভার্দের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়ের পর এই ম্যাচে একাদশে তিনটি পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি| ফাকুন্দো মেদিনার জায়গায় নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, থিয়াগো আলমাদার বদলে লিয়ান্দ্রো পারেদেস এবং আক্রমণভাগে লাউতারো মার্টিনেজের জায়গায় সুযোগ পান হুলিয়ান আলভারেজ| তবে শুরুর ১০ মিনিট থেকেই এলোমেলো ফুটবল খেলতে থাকে আলবিসেলেস্তেরা| মাঝমাঠে বল হারানো আর রক্ষণভাগের শিশুতোষ ভুলের মাশুল দিতে হয় ম্যাচের ১৫ মিনিটেই| মারওয়ান আিত্তয়ার চমৎকার ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে ফারাওদের ১-০ গোলে এগিয়ে নেন ইয়াসের ইব্রাহিম|
পিছিয়ে পড়ে ১৯ মিনিটেই সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা| হাইসেম হাসান বক্সের ভেতর ফাউল করলে পেনাল্টি পায় তারা| কিন্তু অধিনায়ক লিওনেল মেসির নেওয়া নিচু শটটি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দেন মিসরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের| এই মিসের মাধ্যমে বিশ্বকাপের একই আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করার এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনন্য রেকর্ড গড়েন মেসি| এরপর ২৮ মিনিটে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড রুখে দিয়ে এবং ৩৯ মিনিটে আলভারেজের শট ঠেকিয়ে শোবের যেন মিসরের গোলপোস্টে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান| ৩১ মিনিটে মেসির একটি বুলেট গতির শট সাইড পোস্টে লেগে ফিরে এলে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা|
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে নাটকীয়তা রূপ নেয় চরমে| ম্যাচের এক পর্যায়ে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর মারওয়ান আিত্তয়া দাঁড়িয়ে থাকায় ভিএআরের দ্রুত হস্তক্ষেপে মিসরের একটি গোল ফাউলের কারণে বাতিল হয়| তবে ফারাওদের দ্বিতীয় গোলটি আটকে রাখা যায়নি| মোহাম্মদ সালাহর পাস থেকে হাইসেম হাসানের নিচু ক্রসে নিখুঁত শটে বল জালে জড়ান মোস্তফা জিকো| ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা তখন বিদায়ের অতল গহ্বরে|

ঠিক তখনই শুরু হয় মেসি-ম্যাজিক| ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মাত্র চার মিনিটের ঝড়ে ম্যাচ লণ্ডভণ্ড করে দেয় আর্জেন্টিনা| ম্যাচের ৭৪ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মেসির ভাসানো দুর্দান্ত ক্রস থেকে লাফিয়ে উঠে জোরালো হেডে গোল করেন ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো| ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ২-১| এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ৭৭ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ| লাউতারো মার্টিনেজের ˆতরি করা আক্রমণ থেকে বল গনসালো মন্তিয়েলের গায়ে লেগে চলে আসে মেসির সামনে| প্রথম সুযোগেই মেসির নেওয়া শট গোলরক্ষক শোবেরের হাতে লেগে ক্রসবারের নিচে লেগে জালে জড়ায়| ২-২ গোলের সমতায় উল্লাসে ফেটে পড়ে মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম| বিশ^কাপে মেসির গোল সংখ্য এখন ৮ এ পৌঁচ্ছালো| এমবাপ্পে,হাল&্যান্ড ৭ গোল নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন|
ম্যাচের ভাগ্য তখন পেনাল্টি শুটআউটের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই কাউন্টার অ্যাটাক থেকে মিসরের সমর্থকদের কাঁদিয়ে আর্জেন্টাইন শিবিরে আনন্দ ফিরিয়ে আনলেন এনজো ফার্নান্দেজ| দুর্দান্ত এক ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে ২-০ থেকে স্কোরলাইন ৩-২ করে আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেন এই মিডফিল্ডার|এমন অবিশ^াস্য জয়ের আনন্দে সতীর্থদের আলিঙ্গনে কেঁদেছেন মেসি|
ম্যাচে ৬০ শতাংশ বলের দখল আর মাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে এই মহাকাব্যিক জয় টুর্নামেন্টের বাকি দলগুলোর জন্য আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন সুলভ মানসিকতার এক বিরাট সতর্কবার্তা দিয়ে রাখল|