মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, যুদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক চুক্তি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি। বহু সপ্তাহের সংঘাত, প্রাণহানি ও আঞ্চলিক উত্তেজনার পর দু’দেশের মধ্যে সংলাপের পথ খুলে যাওয়া শান্তিকামী মানুষের জন্য আশার বার্তা। তবে এ আশার পাশাপাশি বাস্তবতার একটি কঠিন দিকও রয়েছে। কারণ, সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ ইসরাইল এবং বিশেষত লেবানন পরিস্থিতি এখনও এই উদ্যোগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি, বিপর্যস্ত হয় অর্থনীতি, অনিশ্চয়তায় পড়ে পুরো একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। ইরান, লেবানন এবং আশপাশের অঞ্চলের মানুষ গত কয়েক মাসে সে বাস্তবতার তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। তাই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সাফল্য নয়; বরং একইসাথে মানবিক জায়গা থেকেও এর কোনো বিকল্প নেই। এ চুক্তির গুরুত্ব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা অতিক্রম করে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পায়, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। ফলে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হলে তার সুফল বিশ্বের বহু দেশ ভোগ করবে। তবে শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে আস্থার সংকট। ইরানের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, লেবাননসহ সব সম্মুখসারিতে সংঘাত বন্ধ হওয়া চুক্তির চেতনার অংশ। অন্যদিকে লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, একদিকে আলোচনা চলবে আর অন্যদিকে সংঘাত অব্যাহত থাকবে, এমন বাস্তবতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমঝোতাকেই টিকিয়ে রাখতে পারে না।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আরও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন এবং অতীতেও মন্তব্য করেছেন যে, লেবাননে চলমান সামরিক পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোকে কঠিন করে তুলছে। এ ধরনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনও উপলব্ধি করছে যে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে কূটনৈতিক উদ্যোগের সফলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু নিজের দেশের নিরাপত্তা স্বার্থের কথা উল্লেখ করে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এটি স্বাভাবিক যে প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবে। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে সামরিক শক্তির ব্যবহার যদি নতুন সংঘাত সৃষ্টি করে, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই অস্থিতিশীলতা ডেকে আনে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস বারবার সেই শিক্ষাই দিয়েছে।
চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জব্দ করা সম্পদের মতো জটিল বিষয়গুলো সামনে আসবে। এগুলো বহু বছরের অবিশ্বাস ও বিরোধের সঙ্গে জড়িত। তাই এসব ইস্যুর সমাধানে ধৈর্য, পারস্পরিক সম্মান এবং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। কেবল সামরিক চাপ বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে টেকসই সমাধান অর্জন করা সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ যুদ্ধের ক্লান্তি থেকে মুক্তি চায়। তারা চায় নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং স্বাভাবিক জীবন। তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সফল করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উচিত উত্তেজনা বৃদ্ধিকারী পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা এবং সংলাপের পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিশেষত লেবাননসহ অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
শান্তির সুযোগ বারবার আসে না। বর্তমান উদ্যোগ সেই বিরল সুযোগগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং লাখো মানুষের স্বার্থে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হোক এবং সব পক্ষ এমন আচরণ করুক যা এ শান্তি প্রচেষ্টাকে দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করে। কূটনীতির এ পথই স্পর্শকাতর মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পথ।